সীমান্ত কণ্ঠ প্রতিবেদক | ৭ জানুয়ারি, ২০২৬
সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার টেংরাটিলাবাসীর জন্য ৭ জানুয়ারি কেবল একটি তারিখ নয়, বরং এক বিভীষিকাময় স্মৃতির নাম। আজ সেই ঐতিহাসিক ও বেদনাদায়ক ‘টেংরাটিলা গ্যাস ফিল্ড বিস্ফোরণ’ দিবস। ২০০৫ সালের এই দিনে কানাডীয় কোম্পানি নাইকোর অদক্ষতায় সংঘটিত সেই বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছিল মাইলের পর মাইল এলাকা, যার ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছে স্থানীয় জনপদ।
২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি ছিল পৌষের এক হাড়কাঁপানো শীতের রাত। গভীর রাতে যখন মানুষ ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই বিকট শব্দে টেংরাটিলা নাইকো গ্যাস ফিল্ডে প্রথম বিস্ফোরণটি ঘটে। মুহূর্তের মধ্যেই আকাশচুম্বী আগুনের লেলিহান শিখা চারদিকের ঘন কুয়াশা ভেদ করে এক নরকীয় পরিবেশ তৈরি করে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, আগুনের উত্তাপে গাছপালা পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছিল এবং মাটি ফেটে গ্যাস বের হতে শুরু করেছিল। জীবন বাঁচাতে হাজার হাজার মানুষ পরনের কাপড়টুকু সম্বল করে অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ছুটেছিল। সেই রাতের আতঙ্ক আজও দোয়ারাবাজারের মানুষের মনে সতেজ।
বিস্ফোরণের পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও স্থানীয়রা ভুলেননি সেই দুঃসময়ের বন্ধুত্বের কথা। আজকের এই দিনে এলাকাবাসী গভীর কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছেন সেইসব মানুষদের, যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে দুর্গতদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। অসহায় মানুষকে আশ্রয় দেওয়া, খাবার সরবরাহ করা এবং আতঙ্কিত মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে যারা ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে।
টেংরাটিলা বিস্ফোরণে শুধু জানমালের ক্ষতি হয়নি, বরং ওই অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। নাইকোর অবহেলায় ভূগর্ভস্থ বিপুল পরিমাণ গ্যাস পুড়ে নষ্ট হয়েছে এবং আশপাশের জলাশয় ও কৃষি জমি উর্বরতা হারিয়েছে। উল্লেখ্য যে, একই বছরের জুন মাসে দ্বিতীয় দফায় আবারও সেখানে বিস্ফোরণ ঘটেছিল।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর আন্তর্জাতিক আদালতে নাইকোর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জয় হলেও ক্ষতিগ্রস্তরা এখনো পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণের অপেক্ষায় রয়েছেন। প্রতিবছর ৭ জানুয়ারি এলে টেংরাটিলার মানুষ হারানো সম্পদ আর সেই ভয়াল রাতের কথা মনে করে শিউরে ওঠেন।
স্থানীয়রা বলেছেন, রাতের অন্ধকারে পৌষের ঘন কুয়াশাকে উপেক্ষা করে মানুষ যেভাবে অনিশ্চয়তার পথে ছুটেছিল, তা ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। তবে সেই দুঃসময়ে যারা আশ্রয় দিয়ে মানবিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তারা আজও আমাদের হৃদয়ে ভাস্বর।
মন্তব্য করুন