মিয়ানমারে সম্প্রতি ঘটা ভূমিকম্পের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এবং সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে কেন বড় ভূমিকম্প হতে পারে তা নিয়ে ইউটিউব চ্যানেলে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন বিশিষ্ট জ্যোতিঃপদার্থবিদ অধ্যাপক দীপেন ভট্টাচার্য। সেখানে তিনি বলেছেন, গত ২৮ শে মার্চ ২০২৫ মিয়ানমারের মান্দালয় শহরের কাছে প্রথম ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প এবং তার ১১ মিনিট পরে ৬.৭ মাত্রার আর একটি ভূমিকম্পন হয়। এতে মিয়ানমারে ব্যাপক ধ্বংস, প্রাণহানি ঘটেছে।
এদিকে। এবং মধুপুর ট্র্যাকটা একটা তুলনামূলকভাবে সলিড ব্লক। এর পাশে পলিমাটি সঙ্গে তার একটা সীমানায় চাপ জমবে এবং এই ফল্টটা এ কারণেই গঠিত হয়েছে। এছাড়াও আরো ছোট ছোট ফল্ট বঙ্গীয় অববাহিকায় আছে সেগুলো নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। কারণ এগুলোর বেশিরভাগই আন্ডিফারেনশিয়েটেড।
এবার আসা যাক সবচেয়ে বড় যে টেকটোনিক সঞ্চালন সেটার ব্যাপারে। এটা হলো বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে। ভারতীয় প্লেটের সঙ্গে বার্মা প্লেটের মেথোস্ক্রিয়া। এই মিথোস্ক্রিয়াটা একটু জটিল এবং সেটি বেশ কয়েকটি সমান্তরাল ফল্টলাইনে ভাগ হয়ে গেছে। পাঁচটা ফল্টের কথা বলবো। এর শুরু হবে একদম পশ্চিম দিকের ইন্দো বার্মা ডিটাচডমেন্ট অথবা মূল ডিফরমেশন লাইন থেকে। যেখানে ভারতীয় প্লেট তীর্যকভাবে বার্মা প্লেটের নিচের দিকে অধগমন প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এই ডিফরমেশন লাইন শেষ হয়েছে একদম সাগাইং ফল্টলাইনে। এই কয়েকদিন আগের ভূমিকম্পটা সাগাইং ফল্টলাইনে হয়েছে। এক নম্বর হচ্ছে মূল ডিফিরমেশন ডিটাচট্মেন্ট মেগা থ্রাস্ট। এটা কুমিল্লার ত্রিপুরা অঞ্চল থেকে দক্ষিণে বঙ্গপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। অনেকেই মনে করছেন এটা লকড। অর্থাৎ নড়ছে না। বরং হঠাৎ হঠাৎ এতে জমে থাকা শক্তি বিশাল ভূকম্পনের মাধ্যমে বিকিরিত করছে। ত্রিপুরা অঞ্চলে যতটা না লকড দক্ষিণের আরাকান অঞ্চলে আরো বেশি লকড। ১৭৬২ সনে আরাকান বা চট্টগ্রামের আনুমানিক ৮ দশমিক ৮ রিখটার মানের ভূমিকম্প এই মেগাথ্রাস্ট থেকে সৃষ্ট বলে মনে করা হচ্ছে। এ নিয়ে অনেক কম্পিউটার মডেলিং হয়েছে। মডেলিং বলছে যে প্রতি ১৭০০ বছর ত্রিপুরা অঞ্চলে আর চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রায় ৫০০-৭০০ বছর অন্তর এই ধরনের বড় (৮.৮ মাত্রার ) ভূমিকম্প হতে পারে। এই অঞ্চলে কম্পন খুব ঘনঘন হচ্ছে না। তবে একটা নীরব বিপদ যে কোনোসময় এটা একটা শক্তিশালী ভূমিকম্পে এই চাপ মুক্ত করে দিতে পারে। এতে ব্যপক ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা আছে। পূবদিকে চারটি স্ট্রাইক ফল্ট । প্রথম হচ্ছে কালাদান ফল্ট যেটি একদম পার্বত্য চট্টগ্রামের ধার ঘেঁষে তার পূবে উত্তর দক্ষিণে বিস্তৃত। তারও পূবে চুরচন্দ্রপুর মাও ফল্ট। এরপর আরো পূব দিকে সমান্তরালভাবে উত্তর দক্ষিণে বিস্তৃত কাবও ফল্ট এবং একেবারে সাগাইং ফল্ট। এই যে কালাদান, কাবাও চুরচন্দ্রপুর মাও ফল্ট এগুলো সবই কিছুটা লকড সেখানেও ভূমিকম্প হতে পারে। কিন্তু তাদের পূবে সাগাইং ফল্টের মতো এবং সেই ভূমিকম্পের তীব্রতা হয়তো বেশি হবে না। তবে সাগাইং ফল্ট নিয়ে যে বলা হচ্ছে সেটা ইন্ডিয়ান প্লেটের সঙ্গে নয় বরং বার্মা আর সুন্দ্রা প্লেটের সীমানায়। কিন্তু যেহেতু ইন্ডিয়ান প্লেট বার্মা প্লেটের নিচে ঢুকছে তাই পরোক্ষভাবে ইন্ডিয়ান প্লেটও সাগাইং ফল্টের এই যে ভূমিকম্প তার জন্য দায়ি।
শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াচ্ছে- এতোগুলো ফল্টের কথা বললাম সেগুলো সামগ্রিকভাবে যোগ করি তাহলে কী ধরনের ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেয়া সম্ভব। আসলে আসলে এটা পূর্বাভাস দেয়া সম্ভব নয় আমরা কিছুটা স্পেকিউলেট করতে পারি। অনেক সময় আমরা ভূমিকম্পের রিকারেন্স টাইম অতীত ভূমিকম্পের স্লিপ বা উঠানামা যতটা হয় তার সঙ্গে প্রতি বছর টেকটনিক প্লেট কতটা সরছে তা দিয়ে ভাগ করে একটা আনুমানিক বছর সংখ্যা পেতে পারি। আমি একটা উদাহরণ দিচ্ছি। আমরা যদি বলি ১৭৬২ এর যে আরাকান কম্পন হয়েছিল তাতে ভূমি সরন প্রায় ১৫ মিটার হয়তো পার্থক্য হয়েছে। আর অন্যদিকে ডিফরমেশন টেকটনিক সরন হচ্ছে প্রতি বছর মাত্র ১৫ মিলিমিটার। তাহলে ১৫ মিটারকে যদি ১৫ মিলিমিটার দিয়ে ভাগ করি তাহলে ১ হাজার বছর পাই। অর্থাৎ প্রতি ১ হাজার বছরে ৮.৮ কম্পন পেতে পারি। কিন্তু আমরা যদি মধুপুর ত্রিপুরা ফল্ড বেল্ট ডাউকি সব একত্রে ধরে হিসাব করি তাহলে ৭ মাত্রার, তাহলে আগামী ১০০ বছরে সম্ভবত হয়তো শতকরা ৫০ ভাগ কিন্তু এ ধরনের ভাবিকতা নিতান্তই স্ট্যাটিসটিকাল, এটি নির্দিষ্ট কোনো সময় উল্লেখ করতে পারে না। সেই অর্থ একটি বড় ভূমিকম্প আগামীকাল হতে পারে আবার ৫০ বছর পরেও হতে পারে। এজন্য আমাদের দরকার প্রস্তুতি, হতে পারে বিল্ডিং কোড রেজিস্টেন্স কোড, এবং আমাদের ভোলান্টারি সিস্টেম , ইমার্জেন্সিতে প্রস্তুত থাকা দরকার। এবং মানুষজনের এ বিষয়ে সতেচন থাকা দরকার অবশ্যই। সূত্র: অনলাইন
মন্তব্য করুন