নিজস্ব প্রতিবেদক:: সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার টিলাগাঁও গ্রামের মেয়ে শারমিন জাহান মিতা সম্প্রতি ৪৪তম বিসিএসে সাধারণ শিক্ষা (ইংরেজি) ক্যাডার অর্জন করেছেন। সীমান্ত কণ্ঠ’র সঙ্গে বিশেষ আলাপে তিনি তাঁর শৈশব, শিক্ষাজীবন, বিসিএস প্রস্তুতি ও নতুন প্রার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ শেয়ার করেছেন।
সীমান্ত কণ্ঠ: শারমিন, আপনার শৈশব ও বেড়ে ওঠা কেমন ছিল?
শারমিন: আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা দোয়ারাবাজার উপজেলার টিলাগাঁও গ্রামে। গ্রামটি ছিল প্রত্যন্ত ও নির্মল, তবে জীবনের নানা চ্যালেঞ্জও সঙ্গে এনেছিল। প্রতিদিন খাসিয়ামারা নদী পার করে প্রায় দুই কিমি হেঁটে স্কুলে যেতাম। বৃষ্টি ও বন্যার সময় সেই যাত্রা আরও কঠিন হতো। বাবা-মা দুজনই সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন। তাদের স্বপ্ন ছিল আমি বড় হয়ে দেশের প্রথম সারির সরকারি কর্মকর্তা হব। সেই স্বপ্ন ও পরিবারের সহমর্মিতা আমাকে সব সময় অনুপ্রাণিত করেছে।
সীমান্ত কণ্ঠ: পড়াশোনার যাত্রা কেমন ছিল?
শারমিন: আমার স্কুল জীবন কেটেছে টেংরা সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। ২০১১ সালে এসএসসি এবং ২০১৩ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়েছি। মেডিকেলে পড়াশোনার ইচ্ছে থাকলেও কিছু নাম্বারের কারণে সুযোগ হয়নি। তবে পরে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হই। সেখান থেকে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক ও দ্বিতীয় স্থান অর্জন করি। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন আমাকে শুধু জ্ঞানই দেয়নি, আত্মবিশ্বাস ও লক্ষ্যনিষ্ঠার পাঠও দিয়েছে।
সীমান্ত কণ্ঠ: বিসিএসের জন্য মনোযোগী হওয়ার প্রেক্ষাপট কী ছিল?
শারমিন: আসলে আমি অনার্স শেষ করার পরই বিসিএসের দিকে মনোযোগী হই। আমার স্বামী, যিনি ৩৮তম বিসিএস থেকে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে কর্মরত ছিলেন, বর্তমানে ৪১ বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে কর্মরত রয়েছেন, তাঁর প্রতিশ্রুতি ও উদাহরণ আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে। ২০১৪ সালে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই তিনি আমার প্রতি আত্মবিশ্বাস ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। বিয়ের পরও সেই সমর্থন অব্যাহত ছিল।
সীমান্ত কণ্ঠ: ৪৪তম বিসিএসে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার পাওয়ার অনুভূতি কেমন?
শারমিন: যখন নিজের রোল নম্বর দেখলাম, অনুভূতি ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী আনন্দের। রাতভর পড়াশোনা, আত্মনির্ভরতা এবং দৃঢ়সংকল্পের মাধ্যমে অর্জিত এই সাফল্য সত্যিই জীবনকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। আমি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি এবং বলতে পারি—পরিশ্রম কখনো বৃথা যায় না।
সীমান্ত কণ্ঠ: প্রস্তুতির পথে কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছেন কি?
শারমিন: অনেকেই বলেছিল, বিয়ে হয়ে গেলে ক্যারিয়ার বাধাগ্রস্ত হবে। তবে সৃষ্টিকর্তার সহায়তায় এবং স্বামীর সহমর্মিতা থাকলে সব প্রতিবন্ধকতা জয় করা সম্ভব। তিনি সব সময় বলেছেন, ‘লেগে থাকো, তুমি পারবে।’ সত্যিই এই সহমর্মিতা আমার প্রস্তুতির সবচেয়ে বড় শক্তি।
সীমান্ত কণ্ঠ: নতুন প্রার্থীদের জন্য কী পরামর্শ দেবেন?
শারমিন: ধৈর্য্য, পরিকল্পনা এবং পরিশ্রমই সবচেয়ে বড় সম্পদ। সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ করুন, সময় ও প্রচেষ্টা বিনিয়োগ করুন। নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখুন। কঠিন সময়ে হতাশ হবেন না—কারণ পরিশ্রমীদের সাফল্য কখনো নষ্ট হয় না।
সীমান্ত কণ্ঠ: আপনার এই যাত্রা থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?
শারমিন: নিজের লক্ষ্য নিয়ে দৃঢ় থাকা, অনুপ্রেরণা গ্রহণ করা এবং কঠোর পরিশ্রম—এই তিনটি মূল চাবিকাঠি। সঠিক পরামর্শ ও সঙ্গী থাকলে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপান্তর করা সম্ভব।
🔹 শৈশব ও বেড়ে ওঠা
জন্ম ও বেড়ে ওঠা: টিলাগাঁও গ্রাম, দোয়ারাবাজার।
প্রতিদিন খাসিয়ামারা নদী পার করে প্রায় ২ কিমি হেঁটে স্কুলে যাতায়াত।
কঠিন পরিবেশে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তাকে দৃঢ়সংকল্পী করেছে।
🔹 মা-বাবার ভূমিকা
বাবা: আব্দুল মন্নাফ সরকারি চাকুরী থেকে অবসরপ্রাপ্ত
মা: বেগম ফাতেমা আক্তার পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে কর্মরত।
শারমিন: তাদের সহায়তা, উৎসাহ ও জীবনমূল্যই আমাকে সবসময় অনুপ্রাণিত করেছে। আমি চিরকৃতজ্ঞ।
🔹 শিক্ষাজীবন ও সাফল্য
স্কুল: টেংরা সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
এসএসসি ও এইচএসসি: সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ থেকে জিপিএ ৫।
বিশ্ববিদ্যালয়: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইংরেজি বিভাগ।
স্নাতক: প্রথম স্থান।
মাস্টার্স: দ্বিতীয় স্থান।
—
🔹 বিসিএস যাত্রা
মাস্টার্স শেষ করার পর বিসিএস প্রস্তুতি শুরু।
স্বামী, ৩৮তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার, প্রধান অনুপ্রেরণা।
কঠোর পরিশ্রম ও ধৈর্য্যের মাধ্যমে ৪৪তম বিসিএসে ক্যাডার অর্জন।
—
🔹 পরামর্শ ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য
ধৈর্য্য, পরিকল্পনা ও পরিশ্রমই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
শারমিন: ‘সর্বোপরি নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে চাই। দেশের বাইরে পড়াশোনা করে নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করে দেশে ফিরতে চাই। ছাত্র-ছাত্রীদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য কাজ করতে চাই।’ সম্পাদনা মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী
মন্তব্য করুন