মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী ::
সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলের ঘ্রাণে আর ঢেউয়ের কলতানে মিশে থাকে মরমী সব সুর। সেই সুরের মায়াজালে জীবন সঁপে দেওয়া এক সাধক বাউল মখলিছ আলী। দোয়ারাবাজার উপজেলার শিবপুর গ্রামের এক নিভৃত কোণে আজ থমকে গেছে সেই চারণকবির জীবন-তরণী। প্রবীণ এই বাউল শিল্পী কেবল একজন গায়ক নন, বরং তিনি ভাটি বাংলার লোকসংগীতের জীবন্ত সাধক ।
মখলিছ আলীর সুরের হাতেখড়ি হয়েছিল শৈশবের মেঠো পথ আর বাউল আসর থেকে। মরহুম করিম বকস ও সামসুন নাহারের এই সন্তান সুরের সন্ধানে ঘর ছেড়েছিলেন অল্প বয়সেই। তাঁর সংগীত জীবনের মানচিত্র আঁকা হয়েছে লোকসংগীতের দিকপালদের হাত ধরে।
প্রথমে মরমী সাধক ফকির দুর্বিন শাহের কাছে নিয়মিত তালীম নেন তিনি। এরপর দীর্ঘ তিন বছর বাউল কবিরের সান্নিধ্যে থেকে কঠোর সাধনা চালান। তবে তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল লোকসম্রাট শাহ আব্দুল করিমের সান্নিধ্যে। কিংবদন্তি এই মরমী কবির কাছে থেকে তিনি কেবল গানই শেখেননি, চিনেছিলেন জীবনদর্শন ও মানুষের গহীন অন্তরালের টান। সেই দর্শনের নির্যাসই মখলিছ আলীকে সাধারণ একজন গায়ক থেকে তুলে এনেছিল এক অনন্য উচ্চতায়।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সুনামগঞ্জসহ দেশের আনাচে-কানাচে মখলিছ আলীর কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হয়েছে। তাঁর গানে যেমন ছিল বিচ্ছেদের আকুতি, তেমনি ছিল আধ্যাত্মিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ। তবে গ্রামবাংলার এই সাধক কেবল সুরের জাদুকরই ছিলেন না, এলাকায় তিনি একজন দক্ষ ‘কবিরাজ’ হিসেবেও সমাদৃত। অসুস্থ মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখে তিনি অর্জন করেছিলেন মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা।
সময়ের অমোঘ নিয়মে আজ মখলিছ আলীর কণ্ঠে আর আগের সেই ধার নেই। বার্ধক্যের ভারে শরীর এখন স্থবির। জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসে তিনি ঘরবন্দি সময় কাটাচ্ছেন। এখন আর আসরে যাওয়ার ডাক আসে না, তবলার তালের সাথে তাঁর কণ্ঠের খেলা আর দেখা যায় না। কিন্তু তাঁর মনের মণিকোঠায় আজও অমলিন হয়ে আছে হাজারো মঞ্চ, অজস্র করতালি আর শাহ আব্দুল করিমের সেই অমূল্য স্মৃতিগুলো।
প্রবীণ সাধকের বর্তমান অবস্থা আমাদের এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। মখলিছ আলীর মতো শিল্পীরা আমাদের লোকজ ঐতিহ্যের পাহারাদার। আজ তিনি বার্ধক্যের কাছে পরাজিত হয়ে সুস্থতার জন্য সকলের দোয়া প্রত্যাশী।
আমাদের দেশের এই অমূল্য সম্পদদের মূল্যায়ন কেবল তাঁদের মৃত্যুর পর নয়, জীবিত অবস্থাতেই করা উচিত। মখলিছ আলীর নীরব হয়ে যাওয়া কণ্ঠ আমাদের সাংস্কৃতিক দৈন্যেরই ইঙ্গিত দেয়। এই গুণী মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা আর পাশে দাঁড়ানো এখন আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
মন্তব্য করুন