মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী :: সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার টেংরাটিলা গ্রামটি মানচিত্রে হয়তো ক্ষুদ্র এক বিন্দু, কিন্তু বাংলাদেশের জ্বালানি রাজনীতির ইতিহাসে এটি একটি দগদগে ক্ষতের নাম। ২০০৫ সালে যখন দিগন্ত বিস্তৃত আগুনের লেলিহান শিখায় টেংরাটিলার আকাশ রক্তিম হয়ে উঠেছিল, তখন তা কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ পোড়েনি, পুড়েছিল এ দেশের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আর রাষ্ট্রের জ্বালানি সার্বভৌমত্ব। একজন প্রত্যক্ষদর্শী সংবাদকর্মী এবং এই জনপদের সন্তান হিসেবে আমি দেখেছি সেই আগুনের বিভীষিকা, শুনেছি মানুষের আর্তনাদ, আর লিখেছি তাদের অসহায়ত্বের খতিয়ান। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বিজয়ের সুসংবাদ পাই, তখন সেই পুরনো স্মৃতির ধুলো ঝেড়ে মনে হয়—ন্যায়বিচারের পথ দীর্ঘ হলেও তা শেষ পর্যন্ত সুনিশ্চিত।
২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি এবং ২৪ জুন—দুই দফার সেই বিস্ফোরণ কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা ছিল না। সেটি ছিল একটি বিদেশি কোম্পানির চরম কারিগরি অদক্ষতা আর অবহেলার দলিল। আমি তখন খবরের কাগজের জন্য সংবাদ লিখছি। যখন টেংরাটিলার সেই ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়ালাম, দেখলাম মাটি ফুঁড়ে বেরোচ্ছে আগুনের দানবীয় জিহ্বা। কয়েকশ ফুট উঁচু সেই শিখা যেন আকাশকে স্পর্শ করতে চাইছিল। খবরের কাগজের পাতায় তখন প্রতিদিন হেডলাইন হচ্ছিল ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান, কিন্তু চোখের সামনে দেখছিলাম এক মৃত্যুপুরীর মহড়া।
আমি দেখেছি, কীভাবে মানুষ তাদের শেষ সম্বলটুকু ফেলে রেখে খালি পায়ে জীবন বাঁচাতে অজানার উদ্দেশ্যে ছুটেছে। যে মাটির ওপর তারা ঘর বেঁধেছিল, সেই মাটিই যখন কম্পন আর আগুনের উৎসে পরিণত হলো, তখন মানুষের সেই অসহায়ত্ব ও নিরাপত্তাহীনতা ছিল অবর্ণনীয়। সাংবাদিক হিসেবে যখন ক্ষতিগ্রস্তদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলাম, তখন আমার কলম বারবার থেমে যাচ্ছিল। কারণ, যাদের আর্তনাদ আমি লিখছিলাম, তারা কেউ আমার প্রতিবেশী, স্বজন কেউ বা শৈশবের চেনা মুখ।
টেংরাটিলা (বর্তমানে আজবপুর) গ্যাসক্ষেত্রে কানাডীয় কোম্পানি নাইকোর চরম কারিগরি অদক্ষতা আজ আন্তর্জাতিকভাবে প্রমাণিত। অনুসন্ধানে দেখা যায়, নাইকো অত্যন্ত নিম্নমানের কারিগরি পরিকল্পনা নিয়ে খননকাজ শুরু করেছিল। যথাযথ ‘কেসিং’ ও ‘সিমেন্টিং’ ছাড়াই তারা দ্রুত গ্যাস উত্তোলনের হীন চেষ্টায় লিপ্ত ছিল। এর ফলে চাপের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে ভূগর্ভের গ্যাস অনিয়ন্ত্রিতভাবে উপরিভাগে উঠে আসে এবং প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে।
এই বিস্ফোরণে কয়েক বিলিয়ন ঘনফুট মূল্যবান প্রাকৃতিক গ্যাস পুড়ে নিমিষেই ছাই হয়ে যায়। আগুনের প্রচণ্ড তাপে তৎকালীন টেংরাটিলার মাটির উপরিভাগের তাপমাত্রা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, কয়েক কিলোমিটার এলাকার গাছপালা ও প্রাণিকুল তাৎক্ষণিকভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। ভূ-প্রাকৃতিক গঠনের সেই স্থায়ী বিচ্যুতি আজও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
পরিবেশগত সমীক্ষা বলছে, ওই বিস্ফোরণে আশপাশের বিশাল এলাকার জীববৈচিত্র্য স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাটির উপরিভাগের হিউমাস স্তর পুড়ে যাওয়ায় কৃষিজমির উর্বরা শক্তি আজও স্বাভাবিক পর্যায়ে ফেরেনি। স্থানীয় জলাশয়ের মাছ ও জলজ উদ্ভিদ বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে মারা গিয়েছিল। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের দূষণ। আজও টেংরাটিলার অনেক এলাকায় নলকূপ চাপলে পানির সাথে গ্যাসের বুদবুদ ওঠে। স্থানীয় মানুষেরা আজও রাতে বড় কোনো শব্দ শুনলে আঁতকে ওঠেন—সেই ভয়ংকর ট্রমা আজও তাদের তাড়া করে ফেরে।
বিস্ফোরণের পর পেট্রোবাংলা যখন ক্ষয়ক্ষতির বিপরীতে ৭৪৬ কোটি টাকার বিশাল ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিল, তখন নাইকো তাচ্ছিল্যের সাথে তা প্রত্যাখ্যান করে। উল্টো তারা ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা ঠুকে দিয়ে বাংলাদেশের পাওনা আটকে রাখার ফন্দি আঁটে। কিন্তু দীর্ঘ দুই দশকের আইনি লড়াই শেষে ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সালিশি ট্রাইব্যুনাল (ICSID) এক যুগান্তকারী রায় দিয়েছে।
২০২৬ সালের শুরুতে পেট্রোবাংলার বর্তমান চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আদালত নাইকো রিসোর্সেসকে ৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৫০০ কোটি টাকার উপরে) ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিয়েছে। আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, টেংরাটিলা বিস্ফোরণ কোনো 'অনিবার্য দুর্ঘটনা' বা 'Act of God' ছিল না; এটি ছিল নাইকোর কারিগরি ব্যর্থতা ও চরম দায়িত্বহীনতা। এই রায় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য একটি কড়া বার্তা যে, উন্নয়নের দোহাই দিয়ে উন্নয়নশীল দেশের সম্পদ ও মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা যাবে না।
টেংরাটিলার এই জয় যেমন আনন্দের, তেমনি এর পেছনের ইতিহাস অত্যন্ত তিক্ত। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে অস্বচ্ছ যৌথ অংশীদারিত্ব চুক্তি (JVA) এবং উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে নাইকো এ দেশের গ্যাসক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ পায়। তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী মহলের সাথে নাইকোর ‘তদ্বির’ ও দুর্নীতির অভিযোগগুলো পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রমাণিত হয়েছে। অদক্ষ ও অখ্যাত কোম্পানিকে জাতীয় সম্পদের ভার দেওয়ার যে মাসুল আমরা দিয়েছি, তা যেন ভবিষ্যতে আর কোনো ক্ষেত্রে না ঘটে। চুক্তির প্রতিটি ধারা যদি জাতীয় স্বার্থে সংরক্ষিত না থাকে, তবে তার খেসারত দিতে হয় কয়েক প্রজন্মকে।
এই ঐতিহাসিক রায়ের পর বাংলাদেশের সামনে এখন তিনটি প্রধান কাজ:
১. ক্ষতিপূরণ আদায় ও সুষম বণ্টন: আদালত নির্দেশিত ৪২ মিলিয়ন ডলার যেন কেবল রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না হয়। এই অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ টেংরাটিলার ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিহীন কৃষকদের পুনর্বাসন এবং ওই অঞ্চলের ভেঙে পড়া বাস্তুসংস্থান ও পরিবেশ পুনর্গঠনে সরাসরি ব্যয় করতে হবে। দোয়ারাবাজারের সেই মানুষগুলো যারা গত ২০ বছর ধরে গ্যাসমিশ্রিত পানি ব্যবহার করছে, তাদের নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা এখন রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
২. নিরাপদ খনন ও নতুন তদারকি নীতিমালা: ভবিষ্যতে গভীর সমুদ্র বা স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি অংশীদার নির্বাচনের ক্ষেত্রে 'সেফটি ও এনভায়রনমেন্টাল প্রটোকল' হতে হবে প্রধান মাপকাঠি। কোনো কোম্পানিকে কাজ দেওয়ার আগে তাদের অতীত রেকর্ড ও কারিগরি শক্তির কঠোর অডিট নিশ্চিত করতে হবে।
৩. জ্বালানি সার্বভৌমত্ব ও সক্ষমতা বৃদ্ধি: বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার কারিগরি টিমকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। আমাদের নিজেদের সম্পদ উত্তোলনের সক্ষমতা অর্জনই হবে টেংরাটিলার ট্র্যাজেডির প্রকৃত শিক্ষা। টেংরাটিলার জয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অন্যান্য বিতর্কিত বা অসম চুক্তির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের স্বার্থ পুনরুদ্ধারে সক্রিয় হতে হবে।
ন্যায়বিচার পেতে আমাদের দুই দশক অপেক্ষা করতে হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে টেংরাটিলার সাধারণ মানুষের যে হাহাকার আর প্রকৃতির যে স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, তার সবটুকু হয়তো টাকায় মাপা সম্ভব হবে না। তবে এই রায় এ দেশের মানুষের মনে এই ধ্রুব বিশ্বাস জাগিয়েছে যে—জাতীয় সম্পদ লুটে নিয়ে বা অবহেলা করে কেউ পার পাবে না।
একজন সাংবাদিক হিসেবে সেদিন লিখেছিলাম আগুনের লেলিহান শিখার কথা, আজ লিখছি বিজয়ের গৌরবের কথা। ৪২ মিলিয়ন ডলারের এই প্রলেপ টেংরাটিলার ২০ বছরের দীর্ঘশ্বাসকে কিছুটা হলেও শান্ত করবে। টেংরাটিলার এই জয় কেবল আমাদের জ্বালানি খাতের নয়, বরং এটি জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদার জয়। আগামীর বাংলাদেশে জ্বালানি সম্পদ উত্তোলনের প্রতিটি পদক্ষেপে টেংরাটিলার এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা এবং পরবর্তী আইনি বিজয় যেন আমাদের জন্য ধ্রুবতারা হয়ে কাজ করে।
মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী
সম্পাদক:
বাঁশতলা (লিটল ম্যাগাজিন)
সাপ্তাহিক সীমান্ত কণ্ঠ
ইমেইল: hhalalenews@gmail.com
সহায়ক তথ্যসূত্র: * আন্তর্জাতিক আদালত: ICSID Case No. ARB/10/11 ও ARB/10/18 (ওয়াশিংটন)। * দাপ্তরিক তথ্য: পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান কর্তৃক প্রদত্ত বিবৃতি (জানুয়ারি ২০২৬)। * ঐতিহাসিক ঘটনা: টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র বিস্ফোরণ তদন্ত প্রতিবেদন ২০০৫ এবং নাইকোর আন্তর্জাতিক দুর্নীতি তদন্ত রেকর্ড।
সম্পাদক মণ্ডলীর সভাপতি ও প্রকাশক আলহাজ্ব মো. জাহাঙ্গীর আলম
সম্পাদক: মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী
ইমেইল: theweeklysimanthokantho@gmail.com,
সম্পাদকীয় কার্যালয়: জাবা কমপ্লেক্স (নীচতলা) বালিকা বিদ্যালয় রোড, ছাতক সুনামগঞ্জ।
মোবাইল : ০১৭১৬ ৯০০১৭৩, ০১৭১১০৩৯৭৮৮
Copyright © 2026 সীমান্ত কণ্ঠ. All rights reserved.