সীমান্ত কণ্ঠ প্রতিবেদন:
সাহিত্যের প্রকৃত সাধকরা কখনো কখনো জনতার উল্লাসের বাইরে থাকেন, নিঃশব্দে গড়ে তোলেন তাঁদের সৃষ্টির মিনার। প্রচারের ঝলক নয়, বরং তাঁরা বেছে নেন আত্মমগ্নতার আলোকছায়াময় পথ। ছাতক উপজেলার নোয়ারাই ইউনিয়নের খুরমা গ্রামের কবি ও গীতিকার এস. এম. শরীয়ত উল্লাহ এমনই এক নিভৃতচারী প্রতিভা, যিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে নীরবে, কিন্তু গভীর প্রভাব রেখে চলেছেন।
শুধু কবিতার কালি নয়, তাঁর কলমে মিশেছে গানের সুর, গজলের ধ্বনি, নাটকের সংলাপ, উপন্যাসের আবেগ আর ইতিহাসের নিবেদন। একজন লেখকের যতরকম সম্ভাবনা থাকে, তার প্রায় প্রতিটি ধারায় বিচরণ করেছেন তিনি, অথচ থেকেছেন প্রচারের আলো থেকে দূরে। তাঁর এই স্বনির্বাচিত নীরবতা তাঁকে আরও বেশি করে মহীয়ান করে তোলে।
সৃষ্টিসম্ভারের বিস্ময়
কবি এস. এম. শরীয়ত উল্লাহর সাহিত্যিক ও সঙ্গীতজগত বিস্ময়করভাবে বিস্তৃত। গানের সংখ্যা প্রায় ২,৫০০, কবিতা ৪০০, গণসংগীত ৫০ এবং গজল ৪৭০—এমন বিপুল সৃষ্টি একজন মানুষের জীবনে স্বতঃস্ফূর্ত নয়, এটি নিরন্তর সাধনার ফল।
তাঁর রচিত গজল “তুমি ফুল, সেরা ফুল নাই সমতুল” আজ উত্তর-পূর্ব বাংলার আনাচে-কানাচে মুখে মুখে উচ্চারিত হয়, তার এক মরমী আবেদন আছে, যা সাধারণ শ্রোতার হৃদয়েও দোলা দেয়। শুধু একটি গজলই নয়, এমন অসংখ্য সৃষ্টি দিয়ে তিনি ধর্ম, সমাজ, প্রেম এবং জীবনের গভীর বোধকে সংগীতের ভাষায় অনুবাদ করেছেন।
গ্রন্থমালা ও গীতিকাব্যের ভূমিকা
প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে ‘দরবেশ শাহজালাল (রঃ)’ ও ‘হযরত শাহপরান (রঃ)’ এর জীবনীভিত্তিক রচনার মাধ্যমে তিনি ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতাকে একত্রে মেলাতে পেরেছেন। অন্যদিকে, ‘হৃদয়ে তুমি’ ও ‘জ্বলন্ত প্রেম’ উপন্যাসদ্বয় প্রেম ও পারিবারিক সংকটের ভেতর দিয়ে যাপিত জীবনের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে।
গজল-গ্রন্থ ‘মদিনার ফুল’ তিন খণ্ডে বিভক্ত, যেখানে ইসলামি চেতনাকে সুরের বিন্যাসে হৃদয়গ্রাহী করা হয়েছে। তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থ ‘মাটির সারিন্দা’ কিংবা ‘প্রতিভা-সংগীত’ স্থানীয় শিল্পীদের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিয়েছে, যা সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সাংগঠনিক নেতৃত্বেরও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
একজন সংগঠক ও সমাজসেবক
শুধু লেখালেখি নয়, কবি এস. এম. শরীয়ত উল্লাহ সাংগঠনিকভাবেও সক্রিয়। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন তালিকাভুক্ত গীতিকার, সিলেট বিভাগীয় গীতিকার সংসদের উপদেষ্টা, সুনামগঞ্জ জেলা গীতিকার ফোরামের সহ-সভাপতি এবং ছাতক-দোয়ারা গীতিকবি পরিষদের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এই ভূমিকাগুলো তাঁর শিল্পমানসের সামাজিক দিকটিকেও তুলে ধরে—তিনি কেবল একাকী স্রষ্টা নন, বরং একটি পরিপূর্ণ সাংস্কৃতিক সমাজ গঠনের কারিগর।
সাধনা বনাম প্রচার
এস. এম. শরীয়ত উল্লাহর জীবনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর প্রচারবিমুখতা। যেখানে আধুনিক কালের অনেকেই সামান্য সৃষ্টিতেও আত্মপ্রচারে মরিয়া, সেখানে তিনি নিজেকে তুলে ধরেছেন নিভৃত চারণের মতো। এই গুণই তাঁকে আলাদা করেছে এবং প্রমাণ করেছে যে, প্রকৃত প্রতিভা কখনো বিজ্ঞাপননির্ভর হয় না; সময়ের স্রোত একদিন তাকেই স্মরণ করে, যার ভিত ছিল সত্যিকারের।
উপসংহার: যাঁরা আলো ছড়ান অন্তর থেকে
এস. এম. শরীয়ত উল্লাহর সাহিত্য ও সঙ্গীতচর্চা আমাদের স্থানীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে যেমন সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি তরুণ প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণাও বয়ে এনেছে। তিনি প্রমাণ করেছেন, আন্তরিকতা ও অধ্যবসায় থাকলে কোনো প্রচার ছাড়াও একজন মানুষ হয়ে উঠতে পারেন সাংস্কৃতিক বাতিঘর।
আজকের দিনে, যখন শব্দের চেয়ে শব্দচিত্র বেশি গুরুত্ব পায়, তখন এই নিভৃত সাধকের জীবন আমাদের শেখায়—আলো ছড়ানোর জন্য কখনো কখনো শুধু একটি জ্বলা প্রদীপই যথেষ্ট।
তথ্য সূত্র: ছাতক প্রতিদিন
অনলাইন
---
✍️ মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী
সম্পাদক মণ্ডলীর সভাপতি ও প্রকাশক আলহাজ্ব মো. জাহাঙ্গীর আলম
সম্পাদক: মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী
ইমেইল: theweeklysimanthokantho@gmail.com,
সম্পাদকীয় কার্যালয়: জাবা কমপ্লেক্স (নীচতলা) বালিকা বিদ্যালয় রোড, ছাতক সুনামগঞ্জ।
মোবাইল : ০১৭১৬ ৯০০১৭৩, ০১৭১১০৩৯৭৮৮
Copyright © 2026 সীমান্ত কণ্ঠ. All rights reserved.