উপসম্পাদকীয়
৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৩:২৬ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র পুনরায় চালু: আইনি বিজয়ের পর এখনই সময় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের

মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী

বাংলাদেশের জ্বালানি ইতিহাসে টেংরাটিলা একটি নাম, যা একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও ব্যর্থতার প্রতীক। দীর্ঘ দুই দশকের আইনি ও নীতিগত অচলাবস্থার পর আন্তর্জাতিক সালিশ আদালতে নাইকো রিসোর্সেসের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আইনি বিজয় নিঃসন্দেহে একটি বড় মাইলফলক। এই রায় কেবল একটি বহুজাতিক কোম্পানির দায় নির্ধারণ করেনি; একই সঙ্গে রাষ্ট্রের সামনে টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রকে ঘিরে সিদ্ধান্তহীনতার অজুহাতও সরিয়ে দিয়েছে। প্রশ্ন হলো-এই বিজয় কি বাস্তব নীতিগত পদক্ষেপে রূপ নেবে, নাকি টেংরাটিলা আবারও অবহেলার অন্ধকারে পড়ে থাকবে?

২০০৫ সালে কানাডাভিত্তিক নাইকো রিসোর্সেসের অদক্ষ ও দায়িত্বজ্ঞানহীন খনন কার্যক্রমের ফলেই টেংরাটিলায় পরপর দুটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এতে বিপুল পরিমাণ গ্যাস পুড়ে যায়, ধ্বংস হয় হাজার হাজার একর কৃষিজমি, ফলের বাগান ও জলাশয়, বিপর্যস্ত হয় স্থানীয় জনজীবন ও পরিবেশ। এই বিপর্যয় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না; এটি ছিল দুর্বল রাষ্ট্রীয় তদারকি ও করপোরেট অবহেলার যৌথ ফল। আন্তর্জাতিক সালিশের রায় সেই সত্যকেই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে।

তবু বিস্ময়কর হলো-এই বিপর্যয়ের প্রায় দুই দশক পরও টেংরাটিলা কার্যত পরিত্যক্ত। মাটির নিচে থাকা প্রমাণিত গ্যাসসম্পদ অব্যবহৃত থেকে গেছে, আর উপরিভাগে অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি ও সম্ভাবনা নষ্ট হয়েছে অযতেœ। এর মধ্যেই বাংলাদেশ ক্রমেই আমদানি-নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ফাঁদে পড়েছে। ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি, বৈশ্বিক বাজারে দামের অস্থিরতা ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ জাতীয় অর্থনীতিকে নাজুক করে তুলেছে। এই বাস্তবতায় একটি বড় গ্যাসক্ষেত্র বন্ধ পড়ে থাকা কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়।

টেংরাটিলার প্রশ্নটি তাই কেবল জ্বালানি উত্তোলনের নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও অগ্রাধিকারের প্রশ্ন। জ্বালানি নিরাপত্তা আজ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও কর্মসংস্থান-সবকিছুই নির্ভর করছে স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহের ওপর। অথচ একটি প্রমাণিত গ্যাসক্ষেত্র আইনি জটের অজুহাতে বছরের পর বছর অচল পড়ে থাকা রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতারই প্রতিচ্ছবি।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উপেক্ষা করা যায় না- সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার টেংরাটিলা একটি গভীর পরিবেশগত ও মানবিক সংকটের নাম। বিস্ফোরণের ক্ষত আজও পুরোপুরি মুছে যায়নি। অনেক জলাশয়ে এখনও গ্যাস নির্গমনের চিহ্ন দেখা যায়, পানির উৎসে আর্সেনিক ও অন্যান্য দূষণের অভিযোগ রয়েছে। শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভুগছে স্থানীয় মানুষ। নিরাপদ পানীয় জল ও টেকসই জীবিকার সংকট আজও প্রকট। ফলে টেংরাটিলাকে পুনরায় চালু করার অর্থ শুধু গ্যাস উত্তোলন নয়-এটি পরিবেশ পুনরুদ্ধার ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন।

আন্তর্জাতিক সালিশে বাংলাদেশের আইনি বিজয় এই কারণেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই রায়ের মাধ্যমে নাইকো অধ্যায়ের আইনি অনিশ্চয়তা অনেকাংশে দূর হয়েছে। এখন আর ‘মামলা চলমান’ যুক্তি দেখিয়ে সিদ্ধান্তহীন থাকার সুযোগ নেই। বরং এই বিজয়কে ভিত্তি করে একটি সুস্পষ্ট, সময়বদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রীয় রোডম্যাপ প্রণয়ন করা জরুরি।

এই রোডম্যাপের প্রথম শর্ত হওয়া উচিত-রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে আধুনিক ও নিরাপদ প্রযুক্তি ব্যবহার করে গ্যাসক্ষেত্রের পুনঃখনন। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এখানে কোনো ধরনের কারিগরি ঝুঁকি বা অস্বচ্ছতা বরদাস্ত করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। এটি কোনো দয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়। তৃতীয়ত, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ন্যায্য ক্ষতিপূরণ এবং টেকসই জীবিকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানমুখী উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

টেংরাটিলার ভৌগোলিক অবস্থান এই উন্নয়ন পরিকল্পনাকে বাস্তবসম্মত করে তোলে। মেঘালয়-খাসিয়া পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই অঞ্চল শিল্প, পর্যটন ও মৎস্যভিত্তিক অর্থনীতির জন্য সম্ভাবনাময়। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হলে বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিসিক শিল্প এলাকা, ফিস প্রসেসিং শিল্প ও পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। এতে একদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার হবে, অন্যদিকে আঞ্চলিক বৈষম্য কমিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চারিত হবে।

নাইকো অধ্যায় থেকে রাষ্ট্রের একটি মৌলিক শিক্ষা নেওয়া জরুরি। প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, স্বচ্ছতার অভাব ও জবাবদিহির ঘাটতি থাকলে বহুজাতিক অংশীদারিত্ব জাতীয় স্বার্থের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে। টেংরাটিলা সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর একটি পরীক্ষাক্ষেত্র। এখানে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে অন্য গ্যাসক্ষেত্র বা খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

আইনি বিজয় কখনোই চূড়ান্ত সাফল্য নয়; এটি কেবল একটি দরজা খুলে দেয়। সেই দরজা দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। টেংরাটিলার ক্ষেত্রে সেই দায়িত্ব এখন আর এড়ানোর সুযোগ নেই। সিদ্ধান্তহীনতা মানেই জাতীয় সম্পদের অপচয়, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং মানুষের প্রতি অবিচার। টেংরাটিলা আজ রাষ্ট্রের সদিচ্ছা, দূরদর্শিতা ও সক্ষমতার বাস্তব পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ বাংলাদেশের নেই। আইনি বিজয়ের পর এখনই সময় নীরবতা ভেঙে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার-না হলে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে রাষ্ট্রকেই।

 

মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী
লেখক: কবি ও সাংবাদিক

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দোয়ারাবাজারে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ: প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চেয়ে আবেদন

টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র পুনরায় চালু: আইনি বিজয়ের পর এখনই সময় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের

লুটেরা ও স্বৈরাচার আমাদের অধিকার ছিনিয়ে নিতে পারবে না— আব্দুস সালাম আল মাদানি

‘সুষ্ঠু ভোট হলে লাঙ্গলের বিজয় হবে ’ —ছাতকে জাহাঙ্গীর আলম

টেংরাটিলার অগ্নিদাহ থেকে আইনি বিজয়: জনপদের দীর্ঘশ্বাস ও আমাদের জ্বালানি সার্বভৌমত্ব

দোয়ারাবাজারে নবনির্মিত মডেল মসজিদের উদ্বোধন

বিদ্যুৎ সংযোগ ও লাইসেন্স জটিলতায় পানির হাহাকার: দোয়ারাবাজারে হুমকির মুখে বোরো আবাদ

দোয়ারাবাজারে হাওর রক্ষা বাঁধে ‘অযোগ্য’ পিআইসি বাতিলের দাবি: এলাকাবাসীর তীব্র ক্ষোভ

‘সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রশাসন দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’— জেলা প্রশাসক

দোয়ারাবাজারে এনপিপির সংসদ প্রার্থী আজিজুল হকের প্রচারণা ও লিফলেট বিতরণ

১০

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সঙ্গে সংসদ সদস্য প্রার্থী আব্দুল কাদিরের মতবিনিময়

১১

অগণতান্ত্রিক শক্তি রুখতে ‘না’ ভোটকে বিজয়ী করার আহ্বান জাহাঙ্গীর আলমের

১২

সুনামগঞ্জ-৫ আসনে খেলাফত মজলিস মনোনীত প্রার্থী হাফিজ আব্দুল কাদিরের সাংবাদিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত

১৩

‘ধানের শীষের বিজয় মানেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিজয়’—কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন

১৪

দোয়ারাবাজারে অবৈধ মাটি কাটার অপরাধে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা

১৫

প্রতীক বরাদ্দের পর দোয়ারাবাজারে এনপিপি প্রার্থী আজিজুল হকের মতবিনিময় সভা

১৬

দোয়ারাবাজারে অবৈধ মাটি কাটার ট্রাক চাপায় শিশু নিহত

১৭

ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.)-এর ১৮তম ঈসালে সাওয়াব মাহফিল শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন

১৮

মনোনয়ন বৈধতা পেয়ে জাপা প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের মতবিনিময় সভা

১৯

বিদ্রোহী কাঁটা দূর, ঐক্যবদ্ধ বিএনপি: সুনামগঞ্জ-৫ আসনে ধানের শীষের পক্ষে ভিন্ন সমীকরণ 

২০