বজ্রপাতসহ খুব ভোর থেকেই মুষলধারে অঝোর ধারায় অবিরত বৃষ্টি হচ্ছিলো এবং সকাল থেকেই মন আমার ভীষণরকম খারাপ। কারণ বাসায় যে লোকটা প্রতিদিন দুধ দিতে আসে, তিনি দুধেরর বোতল হাতে ধরিয়ে দিয়ে এক মর্মান্তিক করণ এবং হৃদয় বিদারক বিরাট এক দুঃখের খবর জানালো! আজ সকালে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার আটগাঁও গ্রামে তার মামা শ্বশুড়ের ছেলে রিমন তালুকদার খোলা মাঠে বজ্রপাতে আক্রান্ত হয়ে একটি গবাদি পশুসহ মারা গেছে! অতি অল্প বয়সের টগবগে এক যুবক, খুব ভোরে ঘর থেকে বের হলো গরু নিয়ে, ঘরে ফিরলো লাস হয়ে!
শুধু তাই নয়, খবরে দেখলাম আজ সারা দেশে ১১জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে এই বজ্রপাতে আক্রান্ত হয়ে! কী কষ্টের খবর! প্রাকৃতিক দূর্যোগ বজ্রপাতে আহত হয়ে সুস্থ্য সবল স্বজনদের হঠাৎ মৃত্যুতে কী ভয়ঙ্কর জীবন পার করছে পরিবারগুলো! আহারে জীবন!
বাংলাদেশের আবহাওয়ার প্রেক্ষাপটে এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত প্রতিদিনই কোন না কোন স্থান থেকে বজ্রপাতে আক্রান্ত হয়ে হঠাৎ করে মানুষ মারা যাওয়ার এসব ঘটনা একের পর এক আগেও ঘটেছে, এখনও ঘটে চলেছে এবং ভবিষ্যতেও ঘটতে থাকবে।
প্রাকৃতিক দূর্যোগ বজ্রপাতের হাত থেকে মানুষ, পশু-পাখি, গাছ-পালা কারোই হয়তো স্বাভাবিক মুক্তি নাই, তারপরেও বজ্রপাতের হাত থেকে এই সময়ে নিজেকে এবং নিজের আপনজনকে নিরাপদ রাখতে কিছু বিষয়ের সকর্কতার কোন বিকল্প নাই।
আমার বয়স যখন সাত কি আট হবে, তখনকার সময়ে আমাদের এলাকায় ঢালাগাঁও গ্রামের আব্দুল কাদির( লোকটি গ্রামে বদলী মারা নামে পরিচিত ছিলো) নামের মধ্য বয়স্ক এক লোক মাঠে হাল-চাষ করার সময় দুটি গবাদি পশুসহ বজ্রপাতে হঠাৎ একদিন সকালে স্পটে মারা যায়!
ঘটনাটি এলাকাতে মারাত্মক আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা ছিলো। শতো শতো মানুষ ভীর করেছিলো বজ্রপাতে মৃত লোকটির লাস ও গবাদি পশু দুটির মরদেহ দেখতে! সেই ঘটনা শৈশবকালে আমার শিশু হৃদয়ে বজ্রপাত নিয়ে মারাত্মক ভয় এবং প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলো করেছিলো। স্মৃতির টাইমলাইনে চোখ বুলালে আমি স্পষ্টত সেই ঘটনার সব কিছু মনে করতে পারি।
তাই ডিজিটাল যুগে ভার্চূয়াল জগতে প্রাকৃতিক দূর্যোগ বজ্রপাতের হাত থেকে বেঁচে থাকার জন্য সতর্কতার অংশ হিসাবে এই লেখার অবতারণা। লেখায় তথ্যগতো কোন ভুল হলে আমি ক্ষমাপ্রার্থী।
শুরুতেই বলে রাখি বজ্রপাতের কারন ভিন্ন এক বিষয়। আমি সেদিকে যাচ্ছি না। আমার লেখায় বজ্রপাতের সময় করণী কি তাই নিয়ে আমার জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকে সামান্য কিছু আলোচনা বা শেয়ার করার চেষ্টা করেছিমাত্র।
১) এপ্রিল, মে, জুন-এই তিনমাস হলো বাংলাদেশের আবহাওয়ার প্রেক্ষাপটে বজ্রপাত সংঘটিত হওয়ার মূল সময়। এই সময়ে আকাশ হঠাৎ করে ঘন কালো মেঘে ছেয়ে গেলে বাইরে বের না হওয়াই উত্তম। অতি জরুরী প্রয়োজনে বাইরে বের হতে চাইলে রাবারের জুতা পরে বের হওয়া উচিত। কারন বজ্রপাতের সময় খালি পা বা ভেজা চামড়ার জুতা বিদ্যুৎ পরিবাহী হিসাবে কাজ করে। তাই খালি পা ও ভেজা চামড়ার জুতা এই সময়ে খুবই বিপদজনক।
২) বজ্রপাতের সময় উঁচু গাছ-পালা, বিদ্যূতের খুটি ও মোবাইল টাওয়ারের নীচে এবং বাসার ছাদের উপর অবস্থান না করা উত্তম। কারন এসব জায়গা বজ্রপাতের সময় বিদ্যূৎ স্পর্শে শরীর শকে চলে যাওয়া সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
৩) বজ্রপাতের সময় ধানক্ষেত বা খোলা মাঠে উপস্থিত থাকলে দ্রুত এবং তাড়াতাড়ি সময়ে পায়ের আঙ্গুলের উপর ভর করে চোখ বন্ধ করে কানে হাতে আঙ্গুল দিয়ে বন্ধ করে বসে থাকতে হবে। তবে কোন অবস্থাতেই মাটিতে শুয়ে পড়া যাবে না, কারন মাটিতে শুয়ে পড়লে বিদ্যুতের স্পর্শের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
একজন নাক কান গলারোগ বিশেষজ্ঞ ও হেড-নেক সার্জন হিসাবে সরকারী অফিস ও প্রাইভেট চেম্বারে বজ্রপাতে আহত হয়ে কানে শ্রবণশক্তি কমে গেছে বা প্রায় বধির হয়ে গেছে, এরকম অসংখ্যা রোগিকে আমার ম্যানেজম্যান্ট করতে হয়েছে।
অনেক রোগি পেয়েছি বজ্রপাতের প্রচন্ড শব্দে কানের পর্দা ছিদ্র হয়ে গেছে বা শ্রবণশক্তি বহনকারী স্নায়ু পুরোপুরি ড্যামেজ হয়ে শ্রবণশক্তি হারিয়ে রোগি একেবারে বধির হয়ে গেছে।
৪) বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠের নীচে বা উঁচু স্থানে আরোহণ করা উচিত নয়। উঁচু স্থানে থাকলে দ্রুত নীচে নেমে আসা উচিত এবং খোলা মাঠ, ধানক্ষেত বা কোন সবজি মাঠে অবস্থান করা হলে কাছাকাছি কোন দালান-কোঠা থাকলে তার ভিতরে অবস্থান নেয়া হলে বজ্রপাতে আহত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কমে যায়।
৫)আকাশে ঘন কালোমেঘে ছেয়ে গেলে সমুদ্র, নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর, ডোবা বা কোন জলাশয়ের কাছে অবস্থান না করা উত্তম। কারন বজ্রপাতের সময় সৃষ্ট বিদ্যুৎ তড়ঙ্গ পানির মধ্যে দিয়ে ভালোভাবে দ্রুত পরিবাহিত হয়, ফলে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
৬) বজ্রপাতের সময় গাড়িতে অবস্থান করলে গাড়ির ধাতব অংশ শরীরে স্পর্শ করে না রাখলে ভালো হয় এবং সম্ভব হলে গাড়িটিকে কোন কংক্রিটের ছাদের নীচ রাখা উত্তম।
৭) বজ্রপাতের সময় বাড়ির ধাতব কোন পানির কল, ধাতব সিঁড়ি, ধাতব পাইপ ইত্যাদির স্পর্শে না থাকা উচিত।
৮) বজ্রপাতের সময়ে বাড়িতে অবস্থান করলে বাড়ির জানালা, রেলিং এবং বারান্দায় অবস্থান না করা উত্তম। বাড়ির দরজা-জানালা বন্ধ রাখা উচিত।
৯) বজ্রপাতের সময়ে মোবাইল, ল্যাপটপ, ট্যাব, টিভি, ফ্রিজ, ল্যান্ডফোন ইত্যাদি ইলেকট্রনিক্সস ব্যবহার না করে প্রয়োজনে সম্ভব হলো এদের বিদ্যূৎ সংযোগ বন্ধ করে রাখা উচিত।
১০) বজ্রপাতের ধাতব হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহার করা উচিত নয়। একান্ত প্রয়োজন হলে প্লাস্টিক বা কাঠের হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহার করা নিরাপদ।
১১) বজ্রপাতের সময় অবশ্যই এবং অবশ্যই শিশুদেরকে খোলা মাঠের নীচে খেলতে যাওয়ার অনুমতি দেয়া উচিত নয়। তবে তারা যদি এই সময়ে খোলা খেলার মাঠে উপস্থিত থাকে, তাহলে দ্রুত তাদেরকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসতে হবে।
১২) খোলা মাঠে বজ্রপাতের সময় অনেক মানুষ উপস্থিত থাকলে তাদের উচিত নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়া অথবা কমপক্ষে ৫০ থেকে ১০০ দূরত্ব বজায় রেখে অবস্থান নেয়া।
১৩) বজ্রপাতের সময় বিদ্যুৎ চালিত সকল প্রকার সরঞ্জাম এর প্লাগ খুলে বিদ্যূৎ এর সংযোগ বন্ধ রাখা খুবই জরুরী।
১৪) বজ্রপাতের সময়ে ছাউনীবিহীন নৌকায় মাছ ধরতে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে এবং জলাশয়ে থাকার সময়ে ঘনকালো মেঘে আকাশ ছেয়ে গেলে নৌকা বা জলযানের ছাউনীর নীচে অবস্থান করা অতীব জরুরী।
১৫) বাড়িতে থাকাকালীন সময়ে মারাত্মক বজ্রপাত দেখা দিলে সবাই এক রুমে অবস্থান না করে পৃথক পৃথক রুমে অবস্থান করতে পারলে বজ্রপাতের সামগ্রীক ঝূঁকি অনেকটাই কমে যায়।
১৬) বাড়ি বানানোর সময় দক্ষ ও অভিজ্ঞ ইঞ্জিনীয়ার এর পরামর্শ অনুযায়ী বজ্রপাত নিরোদক পাইপ ব্যবহার করা উচিত।
১৭) বজ্রপাতে আহত রোগির চিকিৎসা এবং বৈদ্যতিক শকে আক্রান্ত রোগির চিকিৎসা পদ্ধতি প্রায় একই প্রকৃতির। তাই বজ্রপাতে আক্রান্ত আহত রোগির চিকিৎসা কালবিলম্ভ না করে অভিজ্ঞ কোন চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়ার পাশাপাশি দ্রুত সব ধরনের জরুরী চিকিৎসা প্রদান করা যায় এমন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত জরুরী।
১৮) বজ্রপাতে আক্রান্ত আহত কোন রোগি প্রাণে বেঁচে গেলেও, পরবর্তীতে নানান জটিলতা ও সামাজিক অবহেলায় তার জীবন পার করতে হয়। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র্যের পাশাপাশি সামাজিক দাবদ্ধতার অংশ হিসাবে হৃদয়বান মানুষদের সব সময় তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত।
১৯) কোন এলাকার আকাশ হঠাৎ কালোমেঘে ছেয়ে গেলে বজ্রপাত শুরু হওয়ার আগে আমাদের শরীরের কিছু সিম্পটমস দেখা দিলে সাথে সাথে সতর্ক হয়ে যেতে হবে। যেমন-
-বিদ্যূতের প্রভাবে শরীর ও মাথার চুল খাড়া হয়ে যাওয়া।
-শরীরের ত্বব শিরশির করতে পারে
– বজ্রপাতে আগ মুহূর্তে আশেপাশে ধাতব পদার্থ থাকলে তা কেঁপে উঠতে পাবে।
২০) সরকারী, বেসরকারী এবং ব্যাক্তিগতো উদ্যোগে বজ্রপাত ঘটার সময়ে অর্থ্যাৎ এপ্রিল, মে, জুন মাসে বজ্রপাতের হাত থেকে মানুষকে বজ্রপাত থেকে বাঁচার জন্য রেডিও, টিভি, ইউটিউব, ফেইসবুক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যাপকহারে সতর্কতামূলক প্রচার অভিযান চালাতে হবে।
শেষ করার আগে বজ্রপাত নিয়ে আমাদের গ্রাম্য সমাজে লোকমুখে প্রচলিত একটি কঠিনতর গালি কিংবা অভিশাপের কথা বলি-
আমাদের গ্রাম্য সমাজে কারো কাছ থেকে মানুষ অত্যাধিক কষ্ট কিংবা লোকসানের শিকার হলে সৃষ্টিকর্তার তরে নিজেরে সঁপে দিয়ে মনেমনে বা প্রকাশ্যে প্রতিপক্ষকে ব্রজপাতকে ঠাডা অবহিত করে একটি গালি দেয় এরকম-‘তর উপর আল্লাহর ঠাডা পরুক।’
সৃষ্টির সেরা জীব হিসাবে এক মানুষ অন্য মানুষকে এরকম গালি দিতে পারে কি না, সেটা ভিন্ন বিষয়; তবে মহান আল্লাহপাক আমাদের মানব সমাজের সবাইকে এবং সেই সাথে আমাদের পরিবেশের পশুপাখি, গাছ-পালা, মৎস্য ও মাৎস্য সম্পদকে প্রাকৃতিত দূর্যোগ ঠাডা তথা বজ্রপাতের মতো ভয়াবহ অভিশাপ থেকে মুক্ত ও নিরাপদে রাখুক, সেই প্রার্থনাটুকু করি সব সময়।
ডা. এম. নূরুল ইসলাম
মন্তব্য করুন