রিমা খান এ্যানী: সমকালীন বাংলা সাহিত্যের প্রান্তিক জনপদ হাওরাঞ্চল থেকে উঠে আসা তরুণ কবি, গবেষক ও সাংবাদিক মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী। তাঁর সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে একটি স্বতন্ত্র কাব্যচেতনার ধারা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর কবিতায় হাওরের প্রকৃতি, লোকজ সংস্কৃতি, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র উঠে এসেছে গভীর অনুভব ও প্রতীকী ভাষায়।
মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী ১ জানুয়ারি সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার লামাসানিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সিলেট ল’ কলেজ থেকে এলএলবি এবং লিডিং ইউনিভার্সিটি থেকে ইসলামিক স্টাডিজে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। কৈশোর থেকেই তাঁর সাহিত্য ও সাংবাদিকতার প্রতি আগ্রহ ছিল, যা পরবর্তীতে পেশাগত জীবনে পরিণত হয়।
হেলালীর কবিতায় হাওরাঞ্চলের জীবন, প্রকৃতি, প্রেম, রাজনীতি এবং সামাজিক বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর কাব্যচেতনায় লোকজ অনুভব ও সমকালীন চিন্তাধারার সমন্বয় দেখা যায়। তিনি বিশ্বাস করেন, কবিতা কেবল সৌন্দর্যের অনুশীলন নয়, বরং সামাজিক দায়বদ্ধতারও এক নির্মোহ প্রকাশ।
সাম্প্রতিক কবিতা (নমুনা):
> প্রহরের অনুমিত দুঃখ
কেবল তুমিই দেখ না
অন্ধকারের ভেতরকার প্রগাঢ় বেদনা
সে-ও তো প্রহরের অনুমিত দুঃখ
কুহক রাত্রির বেদনা এখন জোছনার তরজমায়
শুধু কল্পনার পুরাণ
কুয়াশাগাহনে দূরের নদীতে
ঢেউ ভেসে যায় পারদের মতো
— মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী
(সূত্র: জাগো নিউজ ২৪)হাওরের বুকে শিউলি ছায়া
প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ:
কুড়ানো সুখ (কবিতাগ্রন্থ)
একাত্তরের যুদ্ধবীর (প্রবন্ধ)
১৯৭১: যুদ্ধজয়ীদের কথা (প্রবন্ধ)
প্রেরণার বাতিঘর (আবদুল মজিদ মাস্টার স্মারকগ্রন্থ)
মুক্তিযুদ্ধে জননেতা আবদুল হক (প্রবন্ধ)
স্বপ্ন শতদল (যৌথ কাব্যগ্রন্থ)
সম্পাদনা ও সাংবাদিকতা:
তিনি লিটলম্যাগ বাঁশতলা’র প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যা হাওরাঞ্চলের সাহিত্য ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত। এছাড়াও, তিনি বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছেন এবং দোয়ারাবাজার প্রেসক্লাবের সভাপতি ও হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী-এর কাব্যচেতনা
উত্তরাধুনিক ও প্রতীকী চেতনাবোধ
হেলালী-র কবিতা একটি উত্তরাধুনিক চেতনার পরিসরে গড়ে উঠেছে। তাঁর ভাষা বিমূর্ত, চিত্রকল্প ঘন ও বহুপার্থিক। এক একটি শব্দ বা প্রতীক বহুস্তর অর্থবাহী, যেমন— ‘কাটাতার’, ‘শিউলি ছায়া’, ‘পুলসিরাত’, ‘পিক্সেল’ ইত্যাদি তাঁর কবিতায় নিতান্ত বস্তু নয়, বরং রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ও দার্শনিক অর্থের বিস্তার তৈরি করে।
লোকজ উপমা ও প্রাকৃতিক চিত্রকল্প
হেলালী হাওর, সীমান্ত, পাহাড়, হিজল গাঁও প্রভৃতি লোকজ শব্দ ও প্রকৃতির উপমাকে তাঁর কবিতার মূল কাঠামোতে যুক্ত করেন। তবে এগুলো শুধু নস্টালজিয়া নয়— বরং সমকালীন সংকট ও যান্ত্রিকতার বিপরীতে এক ধরণের শিকড়ের আকুলতা বা অস্তিত্ববাদী অনুধ্যানও বয়ে আনে।
দার্শনিক ও মরমি স্বর
তাঁর কবিতায় ঈশ্বরতত্ত্ব, আত্মশুদ্ধি, জুমআর আধ্যাত্মিকতা, নিঃশব্দ উৎস প্রভৃতি আভাসিত হয়— যা তাঁকে একধরনের মরমি কবিতার ধারাতেও স্থাপন করে। কিন্তু এ মরমিতা সরলধর্মী নয়— এখানে পরাবাস্তব, উত্তরাধুনিক গ্লিচ ও স্মৃতিবিস্মৃতির জটিল গঠনও জড়িত।
সমকালীন সমাজ ও প্রযুক্তি-বীক্ষণ
হেলালী ফেসবুক সংস্কৃতি, অন্তর্জাল-নটী, বিকৃত প্রতিচ্ছবি, ভাষার গ্লিচ— এসব আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সমাজবাস্তবতাকে কবিতায় প্রতীকী ও দর্শনগত দৃষ্টিতে এনেছেন। এতে তাঁর কবিতা কেবল প্রকৃতি-স্মৃতিকাব্য হয়ে থাকে না; বরং সামাজিক ব্যাধি, ক্লান্তি ও আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্বও উঠে আসে।
ছন্দ ও ধ্বনিসংগীত
তাঁর রচনায় মাত্রাবৃত্ত, গীতলতা ও সজীব ধ্বনির ব্যবহার দেখা যায়। প্রতিটি শব্দ গুছিয়ে গেঁথে একটি উচ্চারণ-ছন্দ তৈরি হয়, যা আবৃত্তিযোগ্য এবং শ্রুতিমধুর।
মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী-এর কাব্যচেতনা মূলত একটি উত্তরাধুনিক প্রতীক-গভীর, লোকজ-প্রাকৃতিক ও মরমি দর্শন-নির্ভর চেতনা, যা সমকালীন প্রযুক্তি ও সমাজের অন্তঃবিরোধকেও কাব্যিক ভাষায় ধারণ করে। তাঁর কবিতা শিকড় আর অনিশ্চয়তার মধ্যবর্তী এক গ্লিচিত প্রার্থনার মত, যা পাঠককে প্রথাগত অর্থ ও ভাবনা থেকে বেরিয়ে গিয়ে বহুমাত্রিক অনুবাদের দিকে আহ্বান করে।
মন্তব্য করুন